Opinion

অর্ধ শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে এসেও মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু এত প্রাসঙ্গিক কেন?

পৃথিবীর অনেক দেশ বর্তমানে সাম্প্রদায়িক হানাহানিতে কলুষিত। স্বাধীন বাংলাদেশ এ ব্যাপারে অনেকটাই ভারমুক্ত। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণী ছিল অসা¤প্রদায়িকতা, বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্নও ছিল সেটি। দেশজুড়ে এই অসাম্প্রদায়িকতার প্রবাহ ধরে রাখার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে সামনে রাখা বরাবরই প্রাসঙ্গিক।

আমাদের স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল অতিক্রান্ত হতে চলল। এত দীর্ঘ সময় পার করার পরও স্বাধীনতার সেই সংগ্রাম নিয়ে আলোচনার শেষ নেই, অন্ত নেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আলোচনারও। গণমাধ্যম সরব, সরব রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একটা বড় অংশ, শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীরা তো উচ্চকণ্ঠ সর্বদাই। স্বীকার করছি, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে আলোচনা কিছুটা বেশি হচ্ছে। সেটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে জানার এটি সুযোগও বটে। তবে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে লাগাতারই জীবন্ত ছিল মুক্তিযুদ্ধ। কোনো সন্দেহ নেই বাঙালির জাতিগত ইতিহাসের সবচাইতে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় আমাদের এই স্বাধীনতা সংগ্রাম, সাহিত্যের অফুরন্ত উপকরণ এতে লুক্কায়িত, সাহিত্য স্বভাবতই এ উপকরণকে লুফে নিচ্ছে। এ ধারা চলবেই অনাগতকাল জুড়ে ধরে নেয়া যায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দেহসৌষ্ঠব একাকার। মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ আসলে বঙ্গবন্ধুর নাম অবধারিতভাবে আসবে এটিই সত্য, এটিই ধ্রুব বাস্তবতা।
আড়ালে আবডালে এ সত্যকে এড়িয়ে যেতে চান অনেকে। একাত্তরে খুব ক্ষুদ্র একটা গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, কেউ কেউ দোসর সেজেছিলেন পাক হানাদার বাহিনীর। এদের অনেকে জীবিত আছেন, জীবিত আছে তাদের বশংবদরা। পারিবারিক প্রভাবের কারণে হয়তো সেখানে নীরব উষ্মা আছে মুক্তযুদ্ধবিষয়ক প্রচারণা নিয়ে। আবার রাজনৈতিক কারণে অনেকে জেনেবুঝেও এ ধরনের প্রচারণার বিরোধী। এতে করে তারা ক্ষতিগ্রস্তই হবেন কেবল। ইতিহাসের সত্যপাঠকে অস্বীকার কিংবা তাকে বিকৃত করার অপচেষ্টা গুরুতর হীনমন্যতা। এর দায় নিতে হবে নিজেদেরই। আবার এটাও ঠিক বঙ্গবন্ধুর দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় অনেক চাটুকারের অভ্যুদয় ঘটেছে। স্বভাবগতভাবে এরা স্বার্থবাজ, এদের অতি উৎসাহে অনেকেই বিরক্ত। প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই অতি উৎসাহীদের সতর্ক করছেন, তারা কিছুটা দমিত হলেই ভালো।
মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ে চর্চা ও গবেষণা সাম্প্রতিককালে বহুল পরিমাণে বেড়ে যাওয়ার আরেক কারণ ইতিহাসের সত্যপাঠকে রুদ্ধ করার অপচেষ্টা। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ও ৪ জাতীয় নেতাকে হত্যা করে কুচক্রীমহল ইতিহাসের পাতাকে উল্টোমুখী করতে চেয়েছিল। ভয়ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করতে চায়। নির্বাসনে পাঠাতে উদ্যোগী হয় রক্তের দামে কেনা সংবিধানের ৪ মৌলনীতিকে। ফিরিয়ে আনতে চায় পরাজিত পাকিস্তানি ভাবধারা। অবনমনের এই প্রচেষ্টা চলে দেড় দশক ধরে। দেশ সেসময় শাসিত ছিল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেনা শাসক দ্বারা। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা ছিল বিকৃতির শিকার। বঙ্গবন্ধুকে কালিমালিপ্ত করার সুচতুর প্রচেষ্টা ছিল। রাষ্ট্রীয় প্ররোচনায় তাঁর ভাবমূর্তি ক্রমাগত ক্ষুণ্ন করা হচ্ছিল। নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হচ্ছিল বিকৃত ইতিহাস। পরবর্তী ৫ বছর গণতন্ত্রের আমল হলেও উল্টোযাত্রা থামেনি।
এরপর সরকার বদলের মাধ্যমে সহায়ক পরিপার্শ্ব তৈরি হলে না-বলা কথা নিয়ে একযোগে হাজির হন সাহিত্য-সংস্কৃতিসেবীরা। প্রতিবন্ধকতা এই উচ্ছ¡াস বাড়িয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিষিদ্ধ রাখার তৎপরতার কথা আমরা স্মরণ করতে পারি। ১৯৬১ সাল ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী। সরকার তা উদযাপনে বিধিনিষেধ আরোপ করলে রবীন্দ্রনাথ ছড়িয়ে যান দেশময়। উচ্চ আদালতের একজন বিচারপতিসহ বুদ্ধিজীবী-সংস্কৃতিসেবীরা নেমে আসেন মাঠে, আরো বিপুল আয়তনে পালিত হয় অনুষ্ঠানাদি। পরবর্তী সময় ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ সালে সরকারি প্রচার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার জেরে রবীন্দ্রচর্চা আরো বেড়ে যায়। সেসময়ও প্রদত্ত বাঁধা উচ্ছ্বাস বাড়িয়েছিল।
পূর্বেই বলেছি যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমার্থক। খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবাল এক জায়গায় বলেছিলেন, তাঁকে যদি বাংলাদেশের ইতিহাসটা এক লাইনে বলতে বলা হয়, তিনি তা পারবেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেই লাইনটি হবে একটিমাত্র নামেরÑ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তো বঙ্গবন্ধুকে জানার নতুন উৎস তৈরি হয়েছে। তাঁর লেখা ৩টি বই এখন বাজারে; অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা ও আমার দেখা নয়াচীন। দেশের আরেক প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক ক’দিন আগে শিক্ষার্থীদের উপদেশ দিয়ে বলছিলেন, তারা যেন করোনা ভাইরাসের ছুটিতে ঘরে বন্দি অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর গ্রন্থ ৩টি পাঠ করে তাদের সময়কে অর্থবহ করে তোলে।
অসমাপ্ত আত্মজীবনী আমাদের সামনে দিগন্তের নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে। আমরা এতদিন জানতাম তাঁর জীবনে জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রভাবের কথা, জানতাম বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কথা। বঙ্গবন্ধুর বাবাও যে আলোর দিশারি ছিলেন জানতাম না আমরা অনেকেই। পিতা শেখ লুৎফর রহমান পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘বাবা রাজনীতি কর আপত্তি করব না, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ এ তো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। আর একটা কথা মনে রেখ, Sincerity of purpose and honesty of purpose থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না।’ পুত্রের রাজনীতি করার অর্থ জোগানো, তার পরিবারের ভরণপোষণ সবই করেছেন পিতা। পিতার এই ত্যাগও কিন্তু অসামান্য। অসমাপ্ত আত্মজীবনী যেমন ত্যাগ ও আদর্শের মহিমায় উজ্জ্বল, একই কারণে ভাস্বর কারাগারের রোজনামচা।
অর্ধ শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে এসেও মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু এত প্রাসঙ্গিক কেন এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা নেয়া যাক এবার। ৩০ লাখ লোক দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন, ২ লাখ মা-বোন তাঁদের সম্ভ্রম হারিয়েছেন, পঙ্গুত্ববরণ ও অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। এক আদর্শিক চেতনাবোধ থেকে মানুষ এ ত্যাগ শিকার করেছিল। আমাদের সমাজ ও রাজনীতি থেকে এই আদর্শিক চেতনাবোধ হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে সামাজিক মূল্যবোধ। নৈতিকতা তো উচ্ছন্নেই গেছে বলতে হবে। ঘুষ দুর্নীতি সমাজকে গ্রাস করছে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম তারুণ্যের শক্তির ওপর ভর করে অগ্রসরমান ছিল, ৯ মাসের যুদ্ধে তরুণরাই ছিল অগ্রপথিক, দেশপ্রেমে বলীয়ান। ছাত্রসমাজ আগাগোড়া লড়ে গেছে বিজাতীয় শাসকদের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে, ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তা তাদের মনোজগতে ছিল না। বঙ্গবন্ধু তরুণদেরই নেতা ছিলেন। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক হন, সভাপতি নিযুক্ত হন ৪৬ বছর বয়সে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রধান এই নেতা মাত্র ৫০ উত্তীর্ণ। আজীবন কলুষমুক্ত থেকেছেন, সঙ্গীরাও ছিলেন সেরকমই। ত্যাগ আর আদর্শই ছিল তাঁর পাথেয়। নীতির প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। সমাজে এসব সদ্গুণের প্রতিষ্ঠা দরকার। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু হতে পারেন এ ক্ষেত্রে পথ প্রদর্শক। ছাত্র ও যুবসমাজ আমাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাণভোমরা ছিল।
বলছিলাম যে পাকিস্তান কায়েমের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাঠে নেমেছিলেন বস্তুত বঞ্চনার অবসানের জন্য, সাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে নয়। যে কারণে ১৯৪৬ সালের রায়টের সময় জীবন বাজি রেখে কলকাতার রাস্তা দাপিয়ে বেড়িয়েছেন কেবল মুসলমানদের রক্ষার জন্য নয়, হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য। মানুষের প্রতি অপরিসীম দরদ তাঁকে নির্ঘুম রেখেছিল ১৯৪৩ সালের মহা দুর্ভিক্ষের সময়। সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের মুখে আহার জোগানোর কাজ করেছেন ভলান্টিয়ার হিসেবে, গুরুর আজ্ঞা মেনে। যে বঞ্চনাবোধ তাঁকে পাকিস্তান কায়েমে উদ্বুদ্ধ করেছিল, সেই বঞ্চনাবোধই আবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ করলো শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেলো, কিন্তু বঞ্চনার অবসান কি হয়েছে? ন্যায়ভিত্তিক সমাজ কি আমরা পেয়েছি? স্বল্প পরিসরে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দুরূহ। তবে সাদামাটাভাবে বলা যায়, ক্ষুধামুক্ত সমাজ প্রায় প্রতিষ্ঠার পথে। কিন্তু সামাজিক ন্যায়বিচার, যা বঙ্গবন্ধুর প্রার্থিত ছিল, তার অবস্থা করুণ। বৈষম্য এক লাগামছাড়া অবস্থায় পৌঁছেছে। এর লাগাম টানতে পারলে বঙ্গবন্ধুর আত্মা শান্তি পাবে, স্বাধীনতা অর্থবহ হবে।
তবে একটি বিষয় বেশ প্রশান্তির। পৃথিবীর অনেক দেশ বর্তমানে সাম্প্রদায়িক হানাহানিতে কলুষিত। স্বাধীন বাংলাদেশ এ ব্যাপারে অনেকটাই ভারমুক্ত। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণী ছিল অসাদায়িকতা, বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্নও ছিল সেটি। দেশজুড়ে এই অসাম্প্রদায়িকতার প্রবাহ ধরে রাখার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে সামনে রাখা বরাবরই প্রাসঙ্গিক।

মজিবর রহমান : কলাম লেখক।
mojibsb@gmail.com

The post অর্ধ শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে এসেও মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু এত প্রাসঙ্গিক কেন? appeared first on Bhorer Kagoj.

এ জাতীয় আরো খবর জানতে ভিজিট করুন- ReaLBDnews.com

শেয়ার করুনঃ